বিজনেস

বিজনেসের সঙ্গে কিশোর ক্লাসিকসের সম্পর্ক 

জান্নাতুল ফেরদৌস

প্রকাশিত: ১৬:০০, ১৬ আগস্ট ২০২২

বিজনেসের সঙ্গে কিশোর ক্লাসিকসের সম্পর্ক 

বিজনেসের সঙ্গে কিশোর ক্লাসিকসের সম্পর্ক 

একজন উদ্যোক্তার জন্য কিশোর ক্লাসিকস সিরিজ পড়া গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই গল্পগুলো পড়লে শুধু যে মনস্তাত্ত্বিক উন্নতি হয় তা কিন্তু না,এখান থেকে বিজনেস সম্পর্কিত অনেক অভিজ্ঞতাও অর্জন করা যায়।

আমাদের দেশে মানুষেরা বিজনেস কিংবা অন্যান্য জব সেক্টরে কাজ করার পরেও নিয়মিত পড়াশোনা করা,বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়াকে গুরুত্বের সাথে নেয় না।কারণ সবারই ধারণা একাডেমিক লাইফে কেবল পাঠ্য বই পড়ারই প্রয়োজন আছে।আউট বই পড়া মানে সময় নষ্ট। অভিভাবকদের এই ভুল চিন্তাধারার কারণে একসময়ে বই পড়তে ভালোবাসা বাচ্চাটিও বড় হওয়ার পরে আউটবই পড়াকে অন্যায় বলেই মনে করে।

একাডেমিক লাইফ শেষ হওয়ার পরে বেশিরভাগ স্টুডেন্টই হাফ ছেড়ে বাঁচে,বই পড়ার অভ্যাস থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে ভেবে।চাকরির জন্য বিভিন্ন বই পড়াবাদে অন্যান্য বইও যে তাদের প্রতিদিন নিয়ম করে পড়া উচিত,এই কথাটি তারা বুঝতে পারে না।

আর এই বুঝতে পারার অক্ষমতা থেকেই তৈরী হয় পড়াবিমুখতা।যা স্টুডেন্ট একজন দক্ষ মানুষে পরিণত হতে বাধা প্রদান করে,তাদের ক্যারিয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।পারিবারিক অবস্থা,পরিস্থিতি,ইচ্ছা ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপর নির্ভর করে একজন মানুষ তার ক্যারিয়ার কোন দিকে গোছাবে।

সে কি চাকরি করবে নাকি একজন উদ্যোক্তা হবে!যখন ব্যক্তি উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়,তখন দেখা যায় অনেকক্ষেত্রেই তা হঠকারী সিদ্ধান্তে রুপ নিয়েছে। আবার অনেকের বিজনেসে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব থাকায় শুরুতেই একটা ধাক্কা খেতে হয়।

তাছাড়া বিজনেস কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয় যে,চাইলেই করা যাবে।বিজনেস করতে হলে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান থাকা অতীব জরুরি।আর বিজনেস শুরুর সময়ে অবশ্যই বেসিক নলেজটুকু তো থাকতেই হবে,যদি ভালো করার ইচ্ছা থাকে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে সেবা প্রকাশনীর কিশোর ক্লাসিকস সিরিজ বিজনেসে কিভাবে সহায়ক হয়ে উঠতে পারে?এই সিরিজটি ইউরোপীয়ান সাহিত্যের সেরা কিছু উপন্যাস নিয়ে সমৃদ্ধ।কিশোর উপযোগী হওয়ায় সিরিজের প্রতিটা গল্পই যেকোনো বয়সী মানুষের জন্য পড়ায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ নিয়ে আসে।

এখানে বিভিন্ন প্লটের উপর একেকটা গল্প দাঁড়িয়ে আছে।গল্পের বিষয়বস্তু,চরিত্র,পরিবেশ,পারিপার্শ্বিকতা সবকিছুই একটা আরেকটার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কিন্তু একটি জায়গায় সব গল্পের মিল আছে।আর তা হলো গল্পগুলো আমাদের জীবনের ঘনিষ্ঠ দিকগুলোকে সুন্দর,সহজ আর সাবলীলভাবে তুলে ধরেছে।সেই সাথে প্রতিটা গল্পই আমাদেরকে জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তব এবং নৈতিক শিক্ষা প্রদান করে যা কিনা মানসিকভাবে আমাদেরকে বিভিন্ন বিপদের মোকাবেলা করতে প্রস্তুত করার পাশাপাশি গল্প থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলো প্রয়োজনের সময় নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করতে শেখায়।

এই সিরিজের প্রতিটা গল্পই কিশোর ক্লাসিকস হিসেবে বিজনেসের জন্য সহায়ক।কিন্তু কিছু গল্প আছে যেখানে সরাসরি বিজনেসকেই তুলে ধরা হয়েছে।এরকম একটি গল্প হলো - লেখিকা লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের আত্মজীবনী সিরিজের লেখা 'ফার্মার বয়'। যদিও এটাকে গল্প হিসেবে আখ্যায়িত করছি কিন্তু আদতে এটি লেখিকার স্বামী আলমানযোর ছোটবেলার জীবন নিয়ে লেখা,যা একেবারে সত্যি এবং বাস্তব ঘটনা দিয়ে ভরপুর।

গল্পে দেখা যায় আলমানযোর পরিবারের প্রতিটা সদস্যই কঠোর পরিশ্রম করে।পরিবারে রয়েছে বাবা,মা এবং আলমানযোর ২ বোন আর এক ভাই।ওদের বাবা এবং মা দুজনেই দিনরাত কাজ করার পাশাপাশি নিজের বাচ্চাদেরকেও ছোটবেলা থেকেই দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলছেন।আলমানযোর বাবা তাদের গ্রামের একজন সৎ,স্বাধীন,কঠোর পরিশ্রমী,বুদ্ধিমান,বিবেকবান ব্যক্তি।

তিনি এবং আলমানযোর মা দুজনেই নিজেদের জীবন এবং সন্তানদের জীবনকে ইতিবাচকভাবে গড়ে তুলতে শুরু থেকেই সঠিক আচরণ করেছেন, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।মিলেমিশে কাজ করা,পরস্পরের ভাগ করা কাজগুলো নিষ্ঠার সাথে পালন,একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা,পরিশ্রমকে জীবনে অপরিহার্য মানা,সন্তানদেরকে নিজ নিজ পছন্দের কাজে উৎসাহিত করা,তাদেরকে সঠিক এবং সৎ উপদেশ প্রদান,প্রতিটা বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিয়ে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সন্তানের হাতে ছেড়ে দেওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো তাদের পরিবারকে করে তুলেছিল সেরা।

আলমানযোর বাবা নিজ কর্মগুণে তাদের অঞ্চলের সেরা ধনী কৃষক ছিলেন।নিজের সন্তানদেরকে মানুষ করার ক্ষেত্রে তিনি সবসময় সঠিকটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই বলে শুধু যে শাসন করতেন তা নয়,প্রয়োজন মতো বিনোদন করতে দেওয়ার সুযোগ, পড়াশোনায় উৎসাহী করে তোলা সবকিছুই করতেন তিনি।

যার কারণে সবার ছোট আলমানযো থেকে শুরু করে তার বড় ভাইবোনেরাও নিজ নিজ কাজে পারদর্শী হয়ে উঠেছিল।এই গল্পটার পুরোটাই বিজনেসকেন্দ্রিক।একজন উদ্যোক্তাকে আলমানযোর বাবার মতোই একজন লিডার হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

কেননা উদ্যোক্তার উদ্যোগটি তার সন্তানের মতোই।এখানে তাকে নিজের কাজের যত্ন নিতে হবে,পরিশ্রম করতে হবে তবে অযথা খাটুনি না।বরং বুঝেশুনে বিজনেসে প্রতিটা পদক্ষেপ ফেলতে হবে।তাছাড়া উদ্যোগের সাথে জড়িত প্রতিটা কর্মীর সাথে আলমানযোর বাবা যেমন তার সন্তানদেরকে ট্রিট করতেন সেভাবেই কাজ আদায় করে নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

একজন লিডার হিসেবে কিশোর ক্লাসিক 'ফার্মার বয়' এর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি অর্থাৎ আলমানযোর বাবা একজন দক্ষ এবং যোগ্য বিজনেসম্যান হওয়ায় তার প্রতিটা কাজ ছিল হিসাব করা।তিনি জানতেন তাকে কোনসময় কোন কাজটা করতে হবে এবং কার কাছ থেকে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করে কাজ আদায় করে নেওয়া যাবে।

তাছাড়া বিজনেসে সেভিংসটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কখন কোন বিপদে পড়তে হয় তার কোনো ঠিক নাই।সেক্ষেত্রে অযথা খরচ না করে একজন উদ্যোক্তাকে অবশ্যই নিজের বিজনেস থেকে লাভকৃত অর্থের একটি অংশ অবশ্যই সঞ্চয় করে রাখতে হবে।

লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের অন্যান্য গল্পগুলোও সরাসরি এই বিজনেস এর সাথে সম্পর্কিত।এখানে কেবল একটি গল্পকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরলেও অন্যান্য গল্পগুলো থেকেও বিজনেসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ টিপস পাওয়া যায়। কিশোর ক্লাসিকস এর এই গল্পগুলো একজন উদ্যোক্তাকে নিজ কাজে কতটা ডেডিকেটেড হতে হয়,তা উপলব্ধি করাবে।তাই সবারই অন্তত একবার করে হলেও এই সিরিজ পড়া উচিত।

লেখকঃ ফ্রিল্যান্সার লেখক ইপ্রফিট এবং শিক্ষার্থী (মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ )


 

সিনথিয়া

সর্বাধিক জনপ্রিয়